প্রবাস জীবন বনাম দেশের জীবন: কোনটা ভালো?
জীবনের পথে চলতে গিয়ে অনেকেই ভাবেন, নিজের দেশেই থাকা ভালো না কি দূরে কোথাও গিয়ে নতুন করে শুরু করা ভালো। এই দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় “প্রবাস জীবন” বনাম দেশের জীবন এই প্রশ্নটি। কেউ ভালো আয় আর উন্নত সুযোগের আশায় বিদেশে পাড়ি দেয়, আবার কেউ পরিবার, মাটি আর সংস্কৃতির টানে দেশে থেকে যেতে চায়। তাই কোনটা ভালো এটা আসলে মানুষের স্বপ্ন, বাস্তবতা আর অনুভূতির উপরই নির্ভর করে।
প্রবাসে গেলে তোমার জীবনের ধরণ একেবারে বদলে যাবে। চারপাশে নতুন মানুষ, নতুন ভাষা, নতুন নিয়ম সব কিছুতেই মানিয়ে নিতে হয়, নতুন জীবন যাকে বলে। পরিবার আর পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকাটা অনেক সময় কষ্টের হয়ে পরে অনেকে কাছে। তবু ভালো আয়, নিরাপদ জীবন আর উন্নত সুযোগের টানেই অনেকে এই পথে হাঁটে। তাই “প্রবাস জীবন” শুধু চাকরি নয়, এটা ধৈর্য, লড়াই আর নিজের সঙ্গে প্রতিদিনের নতুন এক পরীক্ষাও বটে, এটা টিকিয়ে রাখতে হয় যত দিন দেশে বাইরে থাকতে হয়।
দেশের জীবন মানে তোমার নিজের মানুষ, নিজের ভাষা আর পরিচিত পরিবেশে দিন কাটানো, দেশের জীবন মতো কোথায় পাবে না তুমি। এখানে প্রতিবেশী, আত্মীয় আর ছোট-বড় সব সম্পর্ক খুব আপন লাগে, দেশে সুন্দর আওয়া পরিবেশ শুধু এখানে পাওয়া যায়। চাইলে যে কোনো সময় মা–বাবার কাছে ছুটে যেতে পারো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারো। যদিও সুযোগ-সুবিধা আর টাকার টান অনেক সময় কম থাকে, তবু এই মাটির টান অনুভব করায় যে শান্তি পাওয়া যায়, তা “প্রবাস জীবন”-এ থেকেও অনেকে মিস করে।
কাজের দিক থেকে ভাবলে প্রবাসে চাকরির সুযোগ অনেক সময় বেশি আর বেতন ও তুলনামূলক ভালো হয়, এর জন্য মানুষ বেশি আগ্রহ প্রকাশ পাই। তুমি যদি পরিশ্রমী হও, তাহলে সেখানে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারো, পরিশ্রম ছাড়া আগাতে পারবে না। কিন্তু কাজের চাপ, লম্বা সময় আর শারীরিক পরিশ্রমও কম নয়, অনেক বেশি। আবার দেশে কাজ পাওয়া তুলনামূলক কঠিন হলেও পরিবার পাশে থাকায় মনোবল বাড়ে, কাজ কিছু মনে হয় না। তাই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে “প্রবাস জীবন” সুযোগ আর চ্যালেঞ্জ দুটোই নিয়ে আসে।

আয়ের দিক থেকে দেখলে প্রবাসে গেলে সাধারণত বেশি টাকা পাওয়া যায়, দেশের থেকে অনেক বেশি। খরচ বেশি হলেও সঠিক ভাবে টাকা জমাতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো সঞ্চয় গড়ে তোলা সম্ভব, কারণ ইনকাম বেশি নিজের কাছে রাখা যায় বেশি। তুমি চাইলে পরিবারকে সাহায্য করতে পারো, ঘর-বাড়ি বানাতে পারো বা ব্যবসা শুরু করতে পারো, কেন না তুমি সারাজীবন বাইরে থাকবে না। কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময় কাজেই কেটে যায়, বিশ্রামের সুযোগ কম থাকে, এটাই বাইরে জীবন। তাই “প্রবাস জীবন” অর্থের দিক থেকে সুবিধাজনক হলেও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে আসে।
প্রবাস সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানুন
জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে প্রবাসে অনেক আধুনিক সুবিধা পাওয়া যায় ভালো রাস্তা, পরিষ্কার পরিবেশ, উন্নত প্রযুক্তি আর সাজানো শহর, সব কিছু উন্নত দিক দেখে পাবে বাইরে। কিন্তু এসবের খরচও অনেক বেশি, বাড়িভাড়া, পরিবহন, খাবার সবকিছুতেই টাকা বেশি লাগে, যেমন পরিবেশ ঠিক তেমনি খরচ। দেশে খরচ তুলনামূলক কম হলেও সুযোগ-সুবিধা সীমিত হতে পারে। তাই বিলাসী আর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের চাপে অনেক সময় “প্রবাস জীবন” সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা অনেক হিসাব-নিকাশের ব্যাপার।
পরিবার থেকে দূরে থাকাটা প্রবাসে থাকার সবচেয়ে কষ্টের দিকগুলোর একটি, যে সবাইকে ছেড়ে থাকতে হবে চাইলে দেখবে পারব না। তোমার কোনো ভালো মন্দ মুহূর্তে মা–বাবা, ভাই–বোন পাশে থাকে না, এই শূন্যতাটা প্রতিদিনই অনুভব করবে, তুমি একটু অসুবিধা হলে কেউকে পাশে পাবে না। উৎসব, বিয়ে কিংবা অসুস্থতার সময় কাছে থাকতে না পারার যন্ত্রণাটা ভেতরে ভেতরে পোড়ায়, এটাই বাইরের জীবন। তাই অনেক টাকা আর সুযোগের মাঝেও “প্রবাস জীবন” এক ধরনের নিঃসঙ্গতা আর না–পাওয়ার কষ্ট নিয়ে আসে।
বিদেশে গেলে তোমাকে একেবারে ভিন্ন সংস্কৃতি আর সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, কিছু করার থাকবে না মেনে নিতে হবে। খাবার, পোশাক, কথা বলার ধরন সবকিছুই আলাদা লাগে। নিজের দেশের মতো খোলামেলা আড্ডা বা উৎসবের আনন্দ সেখানে সহজে পাওয়া যায় না, কিছুই বুঝতে পাবে না কখন কি হয় না হয়। অনেক সময় নিজেকে একা আর বিচ্ছিন্ন মনে হয়। তবু ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে হয়, জীবন পরিবর্তন করার জন্য। তাই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে “প্রবাস জীবন” বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।
ভাষাগত বাধাও প্রবাসে থাকার একটি বড় সমস্যা, সব কিছু বুঝ। তুমি যখন ভালো করে সেই দেশের ভাষা বোঝো না বা বলতে পারো না, তখন সাধারণ কাজও কঠিন হয়ে যায়, কিছু সময় লাগে। অফিসে, দোকানে বা বাসে কথা বলতে গিয়ে নানান ভুল হয়, এতে লজ্জা আর হতাশা তৈরি হয়, কথা বলার সাহস পাওয়া যায় না। অনেক সময় নিজের কথা ঠিকমতো প্রকাশ করতে না পারায় মন খারাপ হয়ে যায়, কি বলব তা নিজে জানি না। এভাবেই ভাষার সমস্যার কারণে “প্রবাস জীবন” মানসিক চাপ আর একাকীত্ব বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষা আর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিক থেকে প্রবাসে অনেক ভালো সুযোগ পাওয়া যায়, দুই টা কাজে লাগে জীবনের জন্য । উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি আর দক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তুমি নিজের ক্যারিয়ারকে আরও শক্ত করতে পারো, শিক্ষা কখনো বিফলে যায় এটা সব সময় মনে রাখতে হবে। সেখানে নতুন নতুন স্কিল শেখার সুযোগ বেশি থাকে, যা ভবিষ্যতে বড় কোনো কাজে সাহায্য করে, তুমি ভেবো না এটাতে কোন লাভ নাই।। তবে পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট ভুলে থাকা যায় না। তাই ভালো ভবিষ্যতের আশায় অনেকেই “প্রবাস জীবন” বেছে নেয়।
নাগরিক সুবিধার দিক দিয়ে অনেক দেশে জীবন ব্যবস্থাপনা বেশ উন্নত, সুযোগ রয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থা সহজ, হাসপাতাল পরিষ্কার, অফিসের কাজ দ্রুত হয়, খুব সকাল সকাল শুরু হবে। রাস্তা-ঘাট, পার্ক, নিরাপত্তা সব কিছুতেই নিয়ম শৃঙ্খলা চোখে পড়ে, সব কিছু আলাদা। এতে জীবন কিছুটা আরামদায়ক হয়ে ওঠে, সুন্দর জীবনের জন্য সব করতে হবে। কিন্তু এই সুযোগ গুলো পেতে গিয়ে অনেক নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়, একটু ভুল হলেই ঝামেলায় পড়তে হয়, সে বিষয় গুলো সচেন থাকতে হবে। তাই সুবিধা থাকলেও “প্রবাস জীবন” সবসময় স্বাধীন মনে হয় না।
নিরাপত্তা আর স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে অনেক বিদেশি দেশ উন্নত সুবিধা দিয়ে থাকে, যা দেশে হয় না। সেখানে হাসপাতাল গুলো আধুনিক, ডাক্তারদের ব্যবস্থাপনা ভালো, আর জরুরি সেবাও দ্রুত হয়, সাথে সাথে সেবা পাওয়া যায়। অসুস্থ হলে তুমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভালো চিকিৎসা পাবে। তবে এই সেবাগুলো পেতে খরচ অনেক বেশি, আর বিমা না থাকলে ঝামেলা বাড়ে বিমা করতে হয়। তাই ভালো ব্যবস্থা থাকলেও “প্রবাস জীবন” সবসময় সহজ হয়ে ওঠে না।
মানসিক শান্তির দিক থেকে দেশের জীবন অনেক সময় বেশি স্বস্তির হয়। নিজের ভাষায় কথা বলা, নিজের খাবার খাওয়া, পরিচিত মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এই সবকিছু মনকে হালকা রাখে, মন ভালো মানে সব কিছু ভালো। কিন্তু প্রবাসে থেকেও কেউ কেউ নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পায়, তবে সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তবু রাতের বেলা মনের ভেতর দেশের কথা, প্রিয় মানুষ গুলোর মুখ ভেসে ওঠে, মন চাই দেখতে। তাই অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও “প্রবাস জীবন” সবসময় পুরো শান্তি দিতে পারে না।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা ভাবলে সবাই চায় একটি নিরাপদ আর সুন্দর ভবিষ্যৎ, সবাই কিন্তু একটা আসায় আসে। তুমি যদি প্রবাসে ভালোভাবে টাকা জমাতে পারো, তাহলে দেশে ফিরে গিয়ে নতুন কিছু শুরু করতে পারবে। আবার কেউ কেউ সেখানেই স্থায়ী হয়ে যেতে চায়, পরিবার গড়ে তোলে। কিন্তু সিদ্ধান্ত যাই হোক, মন সবসময় দেশের মানুষ আর মাটির টান অনুভব করে, দেশকে কখনো ভুলতে পারে না। তাই ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে “প্রবাস জীবন” সুযোগ দিলেও এর সঙ্গে ত্যাগও জড়িয়ে থাকে।
সব দিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, কোন জীবন ভালো এটা পুরোপুরি তোমার চাহিদা আর পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, কারণ তোমার ওপর সবাই আসা করে। কেউ প্রবাসে গিয়ে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, আবার কেউ দেশের মাটিতেই শান্তি খুঁজে পায়, দেশ অনেক কিছু করতে পারে। টাকা, সুযোগ, আরামের পাশাপাশি মনও একটি বড় বিষয় মন শান্তি মানে সব শান্তি । তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের মনকে ভালো করে বুঝে নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। কারণ “প্রবাস জীবন” যেমন আশা করো, তেমনি অনেক না পাওয়ার গল্পও বয়ে আনে।