বর্তমান সময়ে অনেক মানুষই ভালো ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে কাজ করতে যেতে চায়। কিন্তু শুধু বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই সফল হওয়া যায় না। সেখানে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, ধৈর্য, পরিশ্রম এবং মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু সেই সুযোগ পেতে হলে আগে নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হয়। কোন দেশে কোন ধরনের দক্ষতার বেশি প্রয়োজন, কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে এবং কোন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা জরুরি— এসব বিষয় ভালোভাবে জানা থাকলে বিদেশে কাজ পাওয়া এবং সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
সূচিপত্র
- বিদেশে কাজ পাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি
- কেন শুধু ডিগ্রি নয়, স্কিলই এখন মূল চাবিকাঠি
- ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতার গুরুত্ব
- টেকনিক্যাল স্কিল: কম্পিউটার ও সফটওয়্যার জ্ঞান
- ট্রেড স্কিল: নির্মাণ, ইলেকট্রিক, প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং
- সফট স্কিল: আচরণ, সময়ানুবর্তিতা ও টিমওয়ার্ক
- আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের গুরুত্ব
- সিভি (CV) ও বায়োডাটা কিভাবে তৈরি করবে
- ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
- অভিজ্ঞতা না থাকলে কীভাবে শুরু করবে
- কোন দেশের জন্য কোন স্কিল বেশি প্রয়োজন
- অনলাইন কোর্স ও ট্রেনিংয়ের সুযোগ
- বিদেশে কাজ পেতে সাধারণ যে ভুলগুলো হয়
- নতুন দেশে গিয়ে কিভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখবে
- সফল প্রবাসীদের কিছু বাস্তব পরামর্শ
বিদেশে কাজ পাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে বিদেশে কাজ পাওয়া আগের মতো এখন খুব সহজ নয়, কারণ প্রতিটি পদের জন্যই প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে গেছে বর্তমান সময়ে। শুধু বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই হবে না, নিজেকে সেই কাজের জন্য উপযুক্ত করে তুলতে হবে। এখন নিয়োগকর্তারা এমন মানুষ খোঁজে, যাদের কাজের দক্ষতা ভালো এবং যারা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারে তারাকে বেশি গ্রহন করে কাজের জন্য। তাই যারা শেখার আগ্রহ ধরে রাখে, তাদের সুযোগও বেশি।
কেন শুধু ডিগ্রি নয়, স্কিলই এখন মূল চাবিকাঠি
আজকের দিনে শুধু ডিগ্রি থাকলেই আর ভালো চাকরি মেলে না, বিশেষ করে বিদেশে জন্য ভালো কাজ জানতে হবে। অনেক মানুষেরই বড় বড় সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু বাস্তব কাজে তারা পিছিয়ে থাকে, তারা কিন্তু তাদের কাছে খুব যোগ্য হবে না, তবে কাজ জানতে হবে। এ কারণেই এখন নিয়োগকর্তারা বেশি গুরুত্ব দেয় কাজের দক্ষতা-কে তাদেরকে বাছাই করে। যার হাতে-কলমে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে এবং সমস্যার সমাধান করতে পারে, সে ব্যক্তি সহজেই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যায় দক্ষ লোক। তাই স্কিল বাড়ানোই এখন আসল শক্তি।
ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতার গুরুত্ব
বিদেশে গিয়ে কাজ করতে হলে ইংরেজি ভাষায় ভালোভাবে কথা বলতে ও বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইংরেজি ভাষা সব দেশে চলে। অনেক সময় মানুষ কাজ জানে, কিন্তু ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে বা নির্দেশনা বুঝতে পারে না বলে সুযোগ হারায় এর জন্য ২ টা জানতে হবে, অথবা সাহায্য নিতে হবে, বা শিখতে হবে। তাই ইংরেজি বলার চর্চা করা খুব দরকার। ভাষাগত দক্ষতার সাথে সাথে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়ালে যে কোনো দেশে ভালো একটি অবস্থান তৈরি করা অনেক সহজ তোমার জন্য হয়ে যাবে।
টেকনিক্যাল স্কিল: কম্পিউটার ও সফটওয়্যার জ্ঞান
বর্তমান সময়ে প্রায় সব ধরনের কাজেই কম্পিউটার ও বিভিন্ন সফটওয়্যারের ব্যবহার প্রয়োজন হয় ডিজিটাল সময়ে সব কিছুই প্রয়োজন। তাই বিদেশে ভালো চাকরি পেতে হলে সাধারণ কম্পিউটার জ্ঞান এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহার জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব শিখতে হবে বেসিক। ই-মেইল পাঠানো, রিপোর্ট তৈরি করা বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করার জন্য এই দক্ষতা দরকার। যখন কেউ নিয়মিত এসব শিখে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়ায়, তখন তার চাকরির সুযোগও অনেক বেড়ে যায় আগ্রহ করে বেশি।
ট্রেড স্কিল: নির্মাণ, ইলেকট্রিক, প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং
বিদেশে ট্রেড ভিত্তিক কাজের চাহিদা সব সময়ই থাকে, যেমন নির্মাণকাজ, ইলেকট্রিক, প্লাম্বিং বা ওয়েল্ডিং ইত্যাদি। যারা এই ধরনের কাজে দক্ষ, তাদের জন্য ভালো বেতনের সুযোগও বেশি থাকে, মানে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে কোম্পানি তোমার আগ্রহ করবে। এসব কাজে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, না পারলে কোন লাভ নাই। তাই কেউ যদি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারে, তাহলে বিদেশে সে সহজেই ভালো একটি ভালো চাকরি পেতে পারে সহজ ও হবে।
সফট স্কিল: আচরণ, সময়ানুবর্তিতা ও টিমওয়ার্ক
শুধু কাজ জানা নয়, ভালো আচরণ ও সময় মতো কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাস থাকাও বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেন না তুমি কাজ জানো কিন্তু সময় মতো করার অভিজ্ঞতা নাই তাহলে চলবে না। অফিস বা কাজে সবাই মিলেমিশে কাজ করে, তাই টিমওয়ার্কের মানসিকতা থাকা দরকার। যে ব্যক্তি সহকর্মীদের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে এবং নিয়ম-কানুন মেনে চলে, তার প্রতি নিয়োগকর্তার আস্থা বেশি থাকে। এই গুণগুলোর সঙ্গে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়ালে সাফল্য পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়, কাজ বাধ্যতা জানা লাগবে।
আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের গুরুত্ব
বিদেশে কাজের জন্য অনেক সময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কেন না বিভিন্ন কোম্পানি তা দেখতে চাই। এসব সার্টিফিকেট দেখলে নিয়োগকর্তারা সহজেই বুঝতে পারে যে একজন প্রার্থী নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এতে কাজ পাওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। তবে শুধু সার্টিফিকেট থাকলেই হবে না, তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে হবে। যখন সার্টিফিকেটের সাথে নিজের কাজের দক্ষতা যুক্ত হয়, তখন একজন মানুষ অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকে এবং কাজ পাওয়া ৯৯% সম্ভব।
সিভি (CV) ও বায়োডাটা কিভাবে তৈরি করবে
বিদেশে চাকরির জন্য একটি সুন্দর ও গোছানো সিভি বা বায়োডাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এটার ওপর সামনে যেতে পারবে। সিভিতে নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, যোগাযোগের ঠিকানা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দক্ষতা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে হয়। অপ্রয়োজনীয় তথ্য না দিয়ে সংক্ষিপ্ত ও সঠিক তথ্য দিলে নিয়োগকর্তার নজরে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই সিভি তৈরির সময় যত্নবান হওয়া উচিত, কারণ এটিই প্রথম পরিচয়ের মাধ্যম।
ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
ইন্টারভিউর সময় নিজেকে আত্মবিশ্বাসের সাথে উপস্থাপন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভয় পাওয়া যাবে না। অনেকেই ভালো কাজ জানলেও নার্ভাস হয়ে পড়ায় সঠিক ভাবে কথা বলতে পারে না। তাই আগে থেকেই সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুশীলন করা দরকার, একা একা করলে হবে কারো মাধ্যমে দিয়ে করবে। ইন্টারভিউতে নিজের কাজের দক্ষতা সম্পর্কে পরিষ্কার ভাবে বলা এবং আগের অভিজ্ঞতার উদাহরণ দেওয়া থাকলে নিয়োগকর্তার কাছে ভালো ইমপ্রেশন পড়ে। এজন্য প্রস্তুতি ছাড়া কখনোই ইন্টারভিউ দেওয়া উচিত নয়, প্রস্তত হয়ে তোমাকে সামনে আগাতে হবে।
অভিজ্ঞতা না থাকলে কীভাবে শুরু করবে
অনেকেই ভাবে অভিজ্ঞতা না থাকলে বিদেশে কাজ পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আসলে বিষয়টি এমন না, কিছু কাজ জেনে তুমি যেতে পারবে। শুরুতে ছোট কাজ, ইন্টার্নশিপ বা ট্রেনিং নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, পরে তুমি সব পারবে গেলে। পাশাপাশি অনলাইনে শেখা বা স্থানীয়ভাবে ছোটখাটো কাজ করে নিজেকে প্রস্তুত করা যায়। যখন ধীরে ধীরে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়ানো হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতাই একসময় বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। তাই শুরু করতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তুমি থেকে থেকে বড় হবে।
কোন দেশের জন্য কোন স্কিল বেশি প্রয়োজন
প্রতিটি দেশের কাজের চাহিদা এক রকম নয়, ভিন্ন ধরনে রয়ে থাকে। কোনো দেশে নির্মাণ কাজের চাহিদা বেশি, আবার কোথাও নার্সিং, ড্রাইভিং বা আইটি স্কিলের প্রয়োজন হয় বেশি। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে সেই দেশের কাজের বাজার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া খুব জরুরি, সে ভাবে তোমাকে সামন দিকে আগাতে হবে। যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের কাজের দক্ষতা গড়ে তোলে, সে সহজেই অন্যদের থেকে এগিয়ে গিয়ে ভালো সুযোগ পেতে পারে, ভালো কাজ সুযোগ নিজের ওপর ডিমেন্ড করে।
অনলাইন কোর্স ও ট্রেনিংয়ের সুযোগ
এখন শুধু বিদেশে গিয়েই নয়, ঘরে বসেও বিভিন্ন অনলাইন কোর্স ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করা সম্ভব, তবে তোমার জানা বা মিককার আগ্রহ টা বেশি থাকতে হবে। ইউটিউব, গুগল বা বিভিন্ন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটে অনেক ফ্রি ও পেইড কোর্স পাওয়া যায়, যা তুমি সহজে শিখতে পারবে। নিয়মিত অনুশীলন করলে খুব সহজেই নতুন কিছু শেখা যায়। এভাবে কেউ যদি ধীরে ধীরে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারে, তাহলে বিদেশে কাজ পাওয়ার পথ অনেক সহজ হয়ে যায়, এবং তুমি ভালো ফলাফল পাবে।
বিদেশে কাজ পেতে সাধারণ যে ভুলগুলো হয়
অনেকে বিদেশে কাজ পাওয়ার সময় কিছু সাধারণ ভুল করে বসে, যার কারণে সুযোগ হারায়, যে কাজ করবে মন দিয়ে করতে হবে, সঠিক নিয়মে। ঠিকমতো তথ্য না জেনে দালালের কথায় বিশ্বাস করা, ভুল কাগজপত্র জমা দেওয়া বা সিভিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এর মধ্যে অন্যতম। আবার অনেকেই নিজের কাজের দক্ষতা না বাড়িয়েই দ্রুত ভালো চাকরি পেতে চায়, এগুলো কখন করা যাবে না। এসব ভুল এড়িয়ে ধৈর্য ধরে প্রস্তুতি নিলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে, সঠিক ভাবে আগাবে সফল হবে।
নতুন দেশে গিয়ে কিভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখবে
নতুন দেশে গিয়ে টিকে থাকার জন্য প্রথমেই মানসিকভাবে শক্ত হতে হয়, কারণ সব কিছু তোমার জন্য নতুন। সেখানে নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। নিয়ম-কানুন মেনে চলা ও পরিশ্রমী হওয়া খুব দরকার, এটা সবার জন্য বাধ্যতা। পাশাপাশি সহকর্মীদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে কাজ করা সহজ হয়, সবার থেকে ভালো হয়ে চলা। আর যদি কেউ নিয়মিত নিজের কাজের দক্ষতা বাড়াতে থাকে, তাহলে সে ধীরে ধীরে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করে নিতে পারে, সেটা তোমার ওপর নির্ভর করবে।
সফল প্রবাসীদের কিছু বাস্তব পরামর্শ
সফল অনেক প্রবাসীই বলেন, বিদেশে টিকে থাকতে হলে ধৈর্য, পরিশ্রম আর সততার কোনো বিকল্প নেই। এটা একবারে ভুল কথা। শুরুতে কষ্ট হলেও হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নিয়ম মেনে কাজ করা এবং সময়ের মূল্য দেওয়া খুব জরুরি, সময় কে বুঝতে শিখতে হবে। পাশাপাশি যারা নিয়মিত নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করে ও নিজের কাজের দক্ষতা উন্নত করতে থাকে, তারাই ধীরে ধীরে ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারে এবং জীবনে সফলতা অর্জন করে।

